সম্পদ অর্জনে ম্যাকিয়াভেলিয়ান গাইড কিভাবে কাজ করে

এই পৃথীবিতে মানুষ মাত্রই অর্থনেতিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে, জীবন পরিচালনার জন্য আমাদের প্রতিটা মানুষকেই কোন না কোন অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতে হয় বা করাতে হয়। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ছাড়া পৃথীবি স্থবির হয়ে পরবে।

সম্পদ-অর্জনে-ম্যাকিয়াভেলিয়ান-গাইড-কিভাবে-কাজ-করে

তবে সকল মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করলেও সকল মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা কিন্তু  এক রকম হয় না। কোন কোন মানুষ তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যার অবস্থান এমন হয় যে,  অন্য অনেক মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার সমষ্টিও তার ধারে কাছে ঘেষতে পারে না।

পেজ সুচিপত্র ঃ সম্পদ অর্জনে ম্যাকিয়াভেলিয়ান গাইড তত্ব।


সম্পদ অর্জনে ম্যাকিয়াভেলিয়ান গাইড তত্ব

কখনও কি মাথায় এসেছে যে কিছু লোক প্রায় কষ্ট না করেই কিভাবে যেন পুরো দুনিয়া টা চালিয়ে নিচ্ছে। আর ঠিক তার উল্টো দিকে এমন অনেকেই আছেন যারা দিনরাত এক করে খাটছেন, কিন্তু দিন শেষে পকেটা খালিই থেকে যাচ্ছে।

এর পেছনের কারন টা কি শুধু ভাগ্য ? নাকি বহু বছরের পুরনো এক তত্ব, ক্ষমতা আর অর্থের গোপন এক খেলা, যা ম্যাকিয়াভেলি শিখিয়ে গিয়েছিলেন । চলুন আজ এই বিষয়টা নিয়ে একটু গভিরে যাওয়া যাক। 

পরিশ্রম করলেই কি ধনী হওয়া যায়


দেখুন ছোটবেলা থেকেই আমাদের প্রায় সবাইকেতো শিখানো হয়েছে যে, কঠোর পরিশ্রম করলেই সাফল্য আসবে, ধনী হওয়া যাবে, কিন্তু সত্যি কি তাই ? একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন তো, যদি পরিশ্রম করলেই ধনী হওয়া যেতো, তাহলে তো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী হওয়ার কথা ছিল দিন মজুর শ্রেণীর মানুষের। কোন কোম্পনীর মালিকের নয়,

আসল সত্যিটা হল, এই পুরো সিস্টেম টা এমন ভাবে সাজানো, যেখানে, যারা সিস্টেম টা বানিয়েছে মানে মালিকরা, তারাই সবসময় লাভবান হয়,

ম্যাকিয়াভেলির মতে পৃথিবীতে মানুষ মাত্র দুই প্রকারের

ম্যাকিয়াভেলির খুবই শক্তিশালী একটা কথা আছে, এটাই আমাদের আজকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তিনি বলেছেন, “পৃথিবীতে মানুষ মাত্র দুই প্রকারের” এক দল- যারা শিকার করে আর অন্য দল- যাদেরকে শিকার করা হয়। এর মাঝে আর তৃতীয় কোন দল নেই । এই রুঢ়ো শত্যটা মাথায় রেখেই কিন্তু আমাদের আলোচনাটা বুঝতে হবে।
 
সাধারন মানুষ যে একটা আর্থিক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটায়, এটা কিন্তু হুট করে ঘটে যাওয়া কোন ঘোটনা নয় । এটা আসলে খুব সাবধানে পরিকল্পনা করে পাতা ফাঁদ, সেটা এমন একটা সিস্টেম, যেটা এমন ভাবে বানানো হয়েছে , যাতে বেশিরভাগ মানুষ কোনদিনই এর থেকে বেরই হতে না পারে।

অর্থনৈতিক ফাঁদ ঠিক কিভাবে কাজ করে

চলুন তো দেখি এই ফাঁদ টা ঠিক কিভাবে কাজ করে, এই ফাদটা মুলত তিনটা ধাপে কাজ করে,
প্রথমত- একটা চাকরী, এমন একটা চাকরী যা দিয়ে কোন মতে মাসটা চলে যায়, কিন্তু সেখানে ধণী হওয়ার স্বপ্ন দেখাটাও যেন একটা অপরাধ।

দ্বীতিয় ধাপে আসে লোন আর ইএমআই-এর লোভ- দামী ফোন, নতুন গাড়ি, সুন্দর ফ্ল্যাট এই সবের হাতছানি।

সম্পদ-অর্জনে-ম্যাকিয়াভেলিয়ান-গাইড-কিভাবে-কাজ-করে

আর তৃতীয় ধাপে এসে- মানুষ হয়ে যায়, ভয়ের দাস, চাকরিটা যদি চলে যায়! তাহলেতো সব শেষ ! এই ভয়টায় তখন মানুষকে মুখ বুজে সবকিছু সয্য করে নিতে বাধ্য করে । আর এই ফাদের শেষ পরিনতি কি হয়, জানেন ? যেটা হয়, সেটা হল র‌্যাট রেস (RAT RACE )

র‌্যাট রেস (RAT RACE ) কি জিনিস

এটা এমন একটা দৌড়, যেখানে মানুষ শুধু দৌড়াচ্ছে! হাপাচ্ছে! ঘাম ঝেরাচ্ছে! কিন্তু এক পা-ও এগুতে পারছে না! ঠিক যেন একটা গোলক ধাধার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যতই দৌড়ানো হোক না কেন, দিন শেষে সেই একই জায়গায় এসে দাড়াতে হয়। তাহলে প্রশ্ন হল, এই ফাদ থেকে বেরোনোর উপায় টা কি ?

ম্যাকিয়াভেলি এখানে একটা দারুন কথা বলেছেন- তার মতে শিংহের গায়ে অনেক জোর থাকতে পারে, কিন্তু সে ফাদ চিনতে পারে না, ফাদ চেনার জন্য দরকার শেয়ালের মত ধুরততা !

এই ফাঁদ থেকে বের হওয়ার উপায়

আর এই ফাদ থেকে বেরোনোর প্রথম ধাপটায় হল নিজের চিন্তাভাবনা, নিজের দৃষ্ট ভঙ্গিটাকে বদলে ফেলা, পৃথীবিকে একদম একটা নতুন চোখে দেখা, দেখুন ব্যাপারটা তাহলে পুরটায় একদমই দৃষ্টিভঙ্গির। সাধারন মানুষ যেখানে শুধ সমস্যায় দেখে একজন শেয়ালের মত চালাক মানুষ সেখানে ব্যাবসার সুযোগ খুজে নেয়,

ধরুন কোথাও কোন একটা লম্বা লাইন, মানুষ বিরক্ত হয়ে সরকারকে গালি দিচ্ছে, আর ঠিক তখনই একজন বুদ্ধিমান মানুষ সেখানে ঠান্ডা পানির বোতল বিক্রি করার কথা চিন্তা করে ব্যাবসা শুরু করে দিচ্ছে । এটাই হল পার্থক্য, এটাই হল সেই শেয়ালের দৃষ্টি।

আমাদের মস্তিস্কটা রাডার এর মত কাজ করে

জানেন কি ! আমাদের মস্তিস্কো টা ঠিক রাডারের মত কাজ করে, আপনি যদি এর মধ্যে টাকা আয়করা কঠিন এই দারিদ্রের সফটওয়্যারটি ইন্সটল করে রাখেন, তাহলে আপনার রাডার সবসময় তারই প্রমান খুজে বেড়াবে। আর যদি আপনি সেই সফটওয়্যার টা ডিলিট করে দেন, তাহলে দেখবেন আপনার রাডার সব পরিস্থিতিতে বিজনেস, সম্ভাবনা, ইত্যাদি  খুজে বেড়াবে।
বেশ তাহলে এই বার মানুষিকতার বিষয়টা তো গেল
কিন্তু শুধু মানুষিকতা বদলালে তো হবে না, তাই না ? এবার আসতে হবে কৌশলের দিকে ।
সম্পদ অর্জনের জন্য ম্যাকিয়াভেলির কিছু নিয়ম আছে, আর সত্যি বলতে নিয়মগুলো বেশ নির্দয়, সাধারন মানুষের চিন্তাভাবনার ঠিক উল্টো, টাকাকে নিয়ে  দুটো দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বলতে পারেন আকাশ পাতাল তফাৎ।

টাকা সম্পর্কে গরিব এবং ধনী মানুষের দৃ্ষ্টিভঙ্গি

গরিবের মানুষিকতা হল- টাকা একটা ঢালের মত, এটাকে জমিয়ে রাখতে হবে ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য, অন্য দিকে ধনীর মানুষিকতা ঠিক তার উল্টো, তাদের কাছে টাকা হল ঠিক সেনাবাহীনির মত, তাকে ময়দানে নামাতে হবে বিজয়ের জন্য, অর্থাৎ আরো টাকা উপার্জনের জন্য কাজে লাগাতে হবে।
আর আসল চাবিকাঠিটা হল সিস্টেম তৈরি করা, একজন সত্যিকারের ধনী ব্যাক্তি কিন্তু টাকার জন্য নিজে কাজ করে না, সে এমন একটা সিস্টেম বানানোর জন্য কাজ করে, যেটা তার হয়ে টাকা আয় করবে। এমনকি সে যখন ঘুমিয়ে থাকবে তখনও। এই সিস্টেমটাই তাদের জন্য টাকা বানাতে থাকে, আর  একেই বলা হয় অন্ধ টাকা।

আরো পড়ুনঃ ধনী ব্যাক্তিরা কিভাবে আরো ধনী হতে থাকে।


৯৯ ভাগ মানুষ কেন পিছিয়ে পরে

তাহলে প্রশ্ন হল ৯৯ ভাগ মানুষ কেন পিছিয়ে পরে ? কারন তাদের মধ্যে কয়েকটা সাধারন রোগ আছে। যেমন ব্যার্থ হওয়ার ভয়, কি হবে ! কি হবে ! এই নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা । আর সবচেয়ে বড় আরও একটা  রোগ হল আবেগের বসে সিদ্ধান্ত নেয়া। এই আবেগই তাদের আর্থিক ক্ষতির কারন হয়ে দাড়ায় ! 

আর ম্যাকিয়াভেলি ঠিক এখানেই বলছেন , একজন শাসকের মত করে ভাবতে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে ঠান্ডা মাথায়, আবেগ দিয়ে নয়, ভয় দুশ্চিন্তা, হতাশা এগুলো হল সাধারন মানুষের বৈশিষ্ঠ্য । যদি সত্যিই সম্পদ তৈরি করতে চান তবে নিজেকে আবেগ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে জানতে হবে । অনেকটা মেশিনের মত- শুধু কাজ করে যেতে হবে। ফলাফলের চিন্তা না করে, 
সম্পদ অর্জনে ম্যাকিয়াভেলিয়ান গাইড কিভাবে কাজ করে
আচ্ছা এতক্ষন তো আমরা বহু বছর পরুনো নীতির কথা বললাম, এবার চলুন এই একি ধারাগুলকে  একবিংশ শতাব্দিতে মানে আজকের আধুনিক দুনিয়ায় নিয়ে আসা যাক, দেখা যাক আজকের দিনে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র টা আসলে কি !

আজকের দিনে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র টা আসলে কি !

আজকের দিনের সবচেয়ে মুল্যবান মুদ্রা কিন্তু সোনা বা ডলার নয় ! সেটা হল মানুষের মনোযোগ বা এ্যটেনশন, হ্যা ঠিকই পড়ছেন ! যার কছে মানুষের মনোযোগ আছে তার কাছেই ক্ষমতা আছে। যদি কেউ মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, তাহলে পৃথিবীর কোন শক্তিই তাকে ধনী হওয়া থেকে আটকাতে পারবে না ।

আর এই মনোযোগের খেলাতেই কিন্তু  আজ এই দুনিয়াটা পরিস্কার দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে ।

৯৯ শতাংশ মানুষই হলো ক্যনজুমার বা ভক্তা, তারা তাদের সবচেয়ে দামি সম্পদ সময় আর মনোযোগ অন্যের জীবন, রিলস আর ভিডিও দেখে নষ্ট করে, আর বাকি ১ শতাংশ মানুষ তারা হল ক্রিয়েটর বা নির্মাতা, তারা ঠিক সেই জিনিসগুলই তৈরি করে, যা ঐ ৯৯ শতাংশ মানুষ দেখতে চায় , তার বিনিময়ে তাদের ব্যংক  একাউন্টগুলো ভরতে থাকে।

তাহলে আমরা ফাঁদের কথা জানলাম, মানুষিকতা বদলানোর কথা বুঝলাম, এমনকি ক্ষমতার নিয়মগুলোও শিখলাম, কিন্তু সত্যি বলতে এই সমস্ত জ্ঞ্যন একদম অর্থহীন আবর্জনার সমান হয়ে যাবে, যদি শেষ পর্যন্ত একটা চুরান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া না হয় । আর সেই চুরান্ত সিদ্ধান্ত হল- এক্সট্রিম ওনারশিপ

চুরান্ত সিদ্ধান্ত /এক্সট্রিম ওনারশিপ কি

এক্সট্রিম ওনারশিপ বলতে সেই অবস্থাকে বোঝায়, যখন মানুষ নিজের জীবনের সম্পুর্ন দায়িত্ব/নিয়ন্ত্রন নিজেই নিয়ে নেয়। একজন সত্যিকারের ম্যাকিয়াভেলিয়ান মানুষিকতার মানুষ, তার খারাপ অবস্থার জন্য সমাজ, সরকার বা ভাগ্যকে দোষ দেয়না, সে সোজা বলে যদি আমার জীবন খারাপ হয় তবে সেটা আমার দোষ, সেটার জন্য আমি নিজেই দায়ী, আমি নিজেকে বদলাতে পারিনি ।

তাহলে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা এটাই যে দাবার বোর্ডে একটা বড়ি হয়ে থেকে যেতে হবে, নাকি সেই খেলোয়ার হতে হবে  যে, পুরো খেলার চালাটই বদলে দেয়, শিকারী হওয়া নাকি, শিকার হওয়া, এই সিদ্ধান্তটা একান্তই নিজের । 

শেষ কথাঃ
আমরা এই পোষ্ট টি পড়ে যেটা জানতে পারলাম তার সারসংক্ষেপ হল, শুধু কায়িক শ্রমের মাধ্যমেই সম্পদশালী হওয়ার কোন সুযোগ নেই, এই ধারনা টা নিতান্তই দুর্বল । আসলে সম্পদশালী হতে হলে আমাদেরকে কায়িক শ্রমের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ড পরিচালনার মাধ্যমে এমন কৌশল বা সিস্টেম দার করাতে হবে। যেই সিস্টেম আমাদেরকে ধীরে ধীরে ধনী বা সম্পদশালী করে তুলবে। শুধু ঘাম ঝড়িয়ে, শ্রমের মাধ্যমে সম্পদশালী হওয়াটা কঠিন বা প্রায় দুঃস্বপ্নও বলা চলে। অতএব আমাদেরকে কৌশলে হতে হবে, তবেই সম্পদশালী হওয়া সম্ভব হবে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ভদ্রতা বজায় রেখে প্রসঙ্গীক কমমেন্ট করুন

comment url